কালিগঞ্জে থানার এসআই মতিনের বিরুদ্ধে অন্তঃসত্ত্বা নারীকে লাঞ্ছনার চেষ্টা ও মাদক কারবারে সহযোগিতার অভিযোগ
- আপডেট সময় : 03:10:58 pm, Monday, 19 October 2026 97 300 বার পড়া হয়েছে

মোঃ হাফিজুর রহমান, কালিগঞ্জ (সাতক্ষীরা) প্রতিনিধি:
সাতক্ষীরার কালিগঞ্জে এক শিক্ষার্থীকে মারধরের ঘটনার তদন্তে গিয়ে অন্তঃসত্ত্বা এক নারীকে লাঞ্ছিত করার চেষ্টা, তাঁর স্বামীকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর হুমকি এবং সীমান্তবর্তী এলাকায় মাদক ও অস্ত্র ব্যবসা সহ বিভিন্ন অবৈধ মালামাল চোরাচালানের সহযোগিতার আওয়ামী লীগের দোসরের অভিযোগ উঠেছে পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) মতিন বিশ্বাসের বিরুদ্ধে।
দীর্ঘদিন শ্যামনগর থানায় কর্মরত থাকার পর বর্তমানে কালিগঞ্জ থানায় দায়িত্ব পালন করা গোপালগঞ্জের সন্তান আওয়ামী দোসর এই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ক্ষুদ্র মাদক ব্যবসায়ী ও সেবীদের আটক করে অর্থের বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া এবং মাদক, অস্ত্র সাহ বিভিন্ন বিভিন্ন অবৈধ মালামাল চোরাচালান চক্রে সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগও তুলেছেন স্থানীয়দের একাংশ। তবে অন্তঃসত্ত্বা নারীকে লাঞ্ছিত করার চেষ্টা ও হুমকির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এসআই মতিন বিশ্বাস। মাদক কারবারি ও চোরাচালান কারবারে সহযোগিতাসহ অন্যান্য অভিযোগের বিষয়ে তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) দুপুরে কালিগঞ্জ উপজেলার রতনপুর ইউনিয়নের গড়ুইমহল শেখপাড়া গ্রামে নাম বিকৃত করে ডাকাকে কেন্দ্র করে বিরোধের সূত্রপাত হয়। এ ঘটনায় মৃত শেখ আরশাদের ছেলে শেখ শাহাদাত হোসেনের সঙ্গে একই এলাকার শেখ জহিরুল ইসলামের ছেলে হাফিজুর রহমানের কথা-কাটাকাটি ও একপর্যায়ে মারামারি হয়।
এর জেরে গত রবিবার (১৮ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে গড়ুইমহল শেখপাড়া এলাকায় রতনপুর তারকনাথ বিদ্যাপীঠের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. সাব্বিরকে হাফিজুর রহমান চড়-থাপ্পড় মারেন বলে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হলে হাফিজুর রহমান কালিগঞ্জ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরির (জিডি) আবেদন করেন। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে থানার এসআই মতিন বিশ্বাস ঘটনাস্থলে তদন্তে যান।
লাঞ্ছনা ও হুমকির অভিযোগ, ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয়দের অভিযোগ, তদন্তের সময় এসআই মতিন বিশ্বাস স্থানীয় শেখ সোহেলের বাড়িতে গিয়ে তাঁর স্ত্রী সালমা খাতুনকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন। প্রতিবাদ জানালে উক্ত পুলিশ কর্মকর্তা ক্ষিপ্ত হয়ে সালমা খাতুনের গালে চড় মারতে উদ্যত হন। এ সময় স্থানীয়রা এগিয়ে এসে প্রতিবাদ জানালে পরিস্থিতি শান্ত হয়।
সালমা খাতুন দুই সন্তানের জননী এবং বর্তমানে যমজ সন্তানের গর্ভবতী। তিনি অভিযোগ করেন, সন্তান প্রসবের সময় ঘনিয়ে আসায় পুলিশের এমন আচরণে তিনি ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছেন এবং মানসিক চাপে ভুগছেন।
সালমা খাতুনের স্বামী শেখ সোহেল (যিনি রতনপুর ইউনিয়ন পুলিশ কমিটির সেক্রেটারি) অভিযোগ করে বলেন, এসআই মতিন বিশ্বাস তাঁকে গাঁজাসংক্রান্ত মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সম্পৃক্ততা ও ‘জুলাই যোদ্ধা’ পরিচয় দেওয়াকে কেন্দ্র করে তাঁকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। বর্তমানে তাঁর পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।
এ বিষয়ে রতনপুর ইউনিয়নের বিএনপি ওয়ার্ড সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আব্দুল গফ্ফার বলেন, তাঁরা পুলিশ কর্মকর্তাকে বিষয়টি শান্তভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তিনি কথা না শুনে উল্টো বিভিন্ন মামলায় জড়ানোর ভয় দেখান।
মাদক কারবারে সহযোগিতার অভিযোগ, এলাকাবাসীর একাংশের অভিযোগ, শ্যামনগর ও কালিগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী রতনপুর, ধলবাড়িয়া, মথুরেশপুর, ভাড়াশিমলা ইউনিয়ন পরিষদ এলাকার ভারত সীমান্ত বডার সুলপুর, উকশা, বসন্তপুর,বাঁশঝাড়িয়া, শুলপুর ও পার্শ্ববর্তী দুরমুজ খালি, কৈখালী, ভেটখালী এলাকার রুট ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকার মাদকসহ নানা অবৈধ পণ্য দেশে প্রবেশ করে। এসআই মতিন নিয়মিত এসব এলাকায় একা একজন বেসরকারি চালককে সাথে নিয়ে মোটরসাইকেলে সার্বক্ষণিক ঘোরাঘুরি করেন এবং রাতে টর্চলাইট নিয়ে নজরদারির আড়ালে মাদকের বড় বড় চালান নির্বিঘ্নে পারাপারে সহযোগিতা করে মোটা অঙ্কের অর্থ গ্রহণ করেন।
অভিযোগকারীদের দাবি, মাদক বা অবৈধ পণ্যের চালান আটক করা অফিসার ও সহযোগিতা করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হয় এবং মাদক মামলায় জড়ানোর ভয় দেখানো হয়। তাঁদের প্রশ্ন, নিয়মিত টহল সত্ত্বেও দীর্ঘদিনে এসআই মতিনের মাধ্যমে বড় কোনো মাদক ও অবৈধ মালামাল চালান আটক না হওয়া রহস্যজনক। বরং তাঁর সাথে যোগাযোগ রক্ষা করা একাধিক ব্যক্তি ইতিপূর্বে বিপুল পরিমাণ ফেনসিডিলসহ ও বিভিন্ন অবৈধ মালামাল সহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন। গোপালগঞ্জে বাড়ি হওয়ায় রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তিনি শ্যামনগর থেকে কালিগঞ্জে বদলি হয়েও একই কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
এসআই মতিনের বক্তব্য, অন্তঃসত্ত্বা নারীকে লাঞ্ছিত করার চেষ্টা ও হুমকির অভিযোগ অস্বীকার করে এসআই মতিন বিশ্বাস বলেন, হাফিজুর রহমানের জিডির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি তদন্তে গিয়েছিলেন। সেখানে প্রতিপক্ষ তাঁকে বিপাকে ফেলতে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ও জুলাই আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে ‘মব’ সৃষ্টির চেষ্টা করে। পরিস্থিতির অবনতি এড়াতে তিনি সেখান থেকে চলে আসেন।
এছাড়াও এই প্রতিবেদকের কাছে প্রায় দশজনখানেক অভিযোগ আছে, মাদক ব্যবসায়ী ও সেবনকারী দের গ্রেফতার ও বহন কারি গাড়ি আটক করে অর্থের বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি, উত্তাপিত সকল অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ এবং নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন ভুক্তভোগী পরিবার ও এলাকাবাসী। আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে এসআই মতিনের দায়িত্ব পালন, তথ্য প্রযুক্তি সহযোগিতা কল রেকর্ড এবং তাঁর চালকের ভূমিকা তদন্ত করা হলে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে বলে মনে করছেন তাঁরা।






























