ঈদকে সামনে রেখে সরকারি দপ্তরে ‘হলুদ সাংবাদিকদের’ দৌরাত্ম্য : অতিষ্ঠ কর্মকর্তারা
- আপডেট সময় : 02:32:21 am, Saturday, 14 March 2026 127 300 বার পড়া হয়েছে

নিজস্ব প্রতিবেদক: আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে সাতক্ষীরার বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে কথিত ‘হলুদ সাংবাদিকদের’ দৌরাত্ম্য বেড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ঈদ সালামির নামে সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে টাকা দাবি ও চাপ প্রয়োগের ঘটনায় বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন জেলার মূলধারার জাতীয় গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকরা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সাতক্ষীরার কয়েকটি সরকারি দপ্তরকে লক্ষ্য করে কিছু ব্যক্তি গলায় আইডি কার্ড ঝুলিয়ে সাংবাদিক পরিচয়ে অফিসে ঢুকে ঈদের বকশিস দাবি করছেন। অনেকেই নাম-সর্বস্ব ও অখ্যাত পত্রিকার পরিচয় ব্যবহার করে কর্মকর্তাদের কাছ থেকে ৫০০ থেকে ২০০০ টাকা পর্যন্ত ‘ঈদ সালামি’ দাবি করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সরকারি দপ্তরের প্রধান জানান, কিছু ব্যক্তি সাংবাদিক পরিচয়ে এসে ঈদ সালামির নামে টাকা দাবি করছেন। ঈদের এখনও কয়েকদিন বাকি থাকলেও আগেভাগেই বারবার টাকা চাওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে ১০ থেকে ১৫টি গ্রুপ অফিসে এসে টাকা দাবি করেছে। টাকা না দিলে কেউ কেউ অফিসে বসে থাকছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, অনেকেই পত্রিকার নামে ঈদ কার্ড দিয়ে দাওয়াত জানানোর কথা বলে বিনিময়ে টাকা চাইছেন। এতে অফিসের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
আরেক সরকারি কর্মকর্তা বলেন, অফিসের ব্যস্ত সময়েও অপরিচিত কিছু ব্যক্তি সাংবাদিক পরিচয়ে এসে টাকা দাবি করছেন। তাদের দেওয়া পরিচয়পত্রে যেসব পত্রিকার নাম রয়েছে, সেগুলোর অনেকগুলোর নাম আমরা কখনও শুনিনি বা দেখিনি। কেউ নিজেকে জেলা প্রতিনিধি, কেউ স্টাফ রিপোর্টার, আবার কেউ ক্রাইম রিপোর্টার বলে পরিচয় দিচ্ছেন।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, অনেকের সম্পর্কে স্থানীয়ভাবে জানা যায় তারা আগে অন্য পেশায় ছিলেন—কেউ বাসের হেলপার, কেউ হকার বা সাইকেল মিস্ত্রি। পরে বিভিন্নভাবে আইডি কার্ড সংগ্রহ করে সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করছেন। তবে মূলধারার গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা কখনও এ ধরনের আচরণ করেননি বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
নাগরিক নেতা অধ্যাপক ইদ্রিস আলী বলেন, “হলুদ সাংবাদিকদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে হবে। তারা সাংবাদিকতার আড়ালে বিভিন্ন জায়গায় চাঁদাবাজি করছে। ঈদকে সামনে রেখে সরকারি অফিসে গিয়ে কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এতে প্রকৃত সাংবাদিকদের সুনাম ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।”
বৈশাখী টেলিভিশনের সাংবাদিক শামীম পারভেজ বলেন, “হলুদ সাংবাদিকরা গণমাধ্যমের ভাইরাসে পরিণত হয়েছে। তাদের কর্মকাণ্ডের কারণে প্রকৃত সাংবাদিকদের পরিচয় দিতে অনেক সময় বিব্রত হতে হয়। ভূঁইফোড় পত্রিকার কার্ড ব্যবহার করে সরকারি দপ্তরে গিয়ে ঈদ সালামির নামে টাকা দাবি করা বন্ধ হওয়া জরুরি।”
ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস ও ভোরের আকাশ পত্রিকার সাতক্ষীরা প্রতিনিধি খন্দকার আনিছুর রহমান বলেন, “হলুদ সাংবাদিকদের কারণে সাংবাদিকতার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। মাত্র ৫০০ বা ১০০০ টাকার জন্য সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। ২৩ বছর সাংবাদিকতা করেছি—আজ মনে হচ্ছে এই পেশা ছেড়ে দিতে হবে। প্রশাসন এসব ব্যক্তির তালিকা প্রকাশ করলে মানুষ প্রকৃত সাংবাদিকদের চিনতে পারবে।”
এশিয়ান টেলিভিশনের স্টাফ রিপোর্টার মশিউর ফিরোজ বলেন, “হলুদ সাংবাদিকতার কারণে এই মহান পেশা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। সাংবাদিকতার সুনাম রক্ষায় সিনিয়র সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া জরুরি। সরকারি দপ্তরে যারা ঈদ সালামির নামে কর্মকর্তাদের হয়রানি করছে, তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।”
দৈনিক জনবাণীর সাংবাদিক মোস্তফা রায়হান সিদ্দিকী বলেন, “হলুদ সাংবাদিকদের কারণে সাতক্ষীরার সাংবাদিকতা আজ সংকটে। অনেক ক্ষেত্রে টাকা না পেলে সরকারি কর্মকর্তাদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলার মূলধারার সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসা দরকার।”






























